ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট পরিচালিত ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। তাদের অভিযোগ, স্কুলে স্যার হিজাব পরিহিতদেরকে জিন্স ও টপসে দেখতে চান। এছাড়াও উনি স্কুল ক্যাম্পাসে ছেলে আর মেয়ে শিক্ষার্থী একসঙ্গে কথা বললে ভিডিও করে রাখেন। পরে সেটি অধ্যক্ষ ও তাদের বাবা-মাকে পাঠাবেন বলে হুমকিও দেন।
এসব অভিযোগ উঠার পর তার বিরুদ্ধে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ। আজ রবিবার (১০ মে) বিকেলে বিষয়টি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নিশ্চিত করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. জামিল উদ্দীন। তিনি বলেন, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আপত্তিকর আচরণের অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেছি।
অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের নাম বরুণ কুমার সাহা। তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
জানা গেছে, শিক্ষক বরুণ কুমার সাহা অনেক দিন ধরে স্কুলের ছাত্রীদের সঙ্গে আপত্তিকর আচরণ করে আসছেন। শুরুতে বিষয়টি নিয়ে মুখ না খুললেও আজ রবিবার দুপুরে স্কুলে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন একাধিক ভুক্তভোগী ছাত্রী।
তারা অভিযোগ করে বলেন, ‘বরুণ কুমার বিশ্বাস সিনিয়র টিচার হওয়ার কারণে প্রায়ই তিনি ক্লাসে আগের ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কথা বলেন। তখন নাকি তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্র্যাক্টিকাল ক্লাস করতে গিয়ে একজন শিক্ষার্থী তার হাত বেধে দেয়। তিনি ক্লাসে এসে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সাদিয়ার কাছ থেকেও আমি এটা আশা করি। একজন টিচার কীভাবে এসব কথা বলেন?
হিজাব পরিহিত এক ছাত্রী বলেন, ‘একদিন আমাকে তিনি বলেন তার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরদের সঙ্গে নাকি তিনি ওয়েস্টার্ণ ড্রেস নিয়ে কথা বলতেন। তিনি আমাকে বলেন তুমি ২০ বছর পরে টপ আর জিন্স পড়ে আসলে আমি তোমাকে চিনতেই পারবো না। একজন শিক্ষকের মুখে কী এসব কথা মানায়? আমি তখন প্রশাসনকে জানাই বিষয়গুলো। তখন তারা আমাকে জানায় তারা এসব ঘটনা তদন্তে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি।’
ওই শিক্ষার্থী আরও জানান, ‘আমি এরপর প্রতিদিন গিয়ে জিজ্ঞেস করতাম যে স্যার/ম্যাম বরুণ স্যারের ব্যাপারে কোনো তথ্য আছে কিনা। তখন তারা আমাকে জানায় তদন্ত কমিটিতে যেসকল শিক্ষক আছেন তারা এখন বাইরে। তারা আসলে দেন তদন্ত চলবে- এই দোহায় তারা দিচ্ছিল।‘
আরেক নারী শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, তিনি (বরুণ স্যার) ক্লাসে খারাপ ব্যবহার করেন, কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়ে কথা বলেন। যা আমাদের কাছে অনেক খারাপ লাগে। ওনি কোনো ছেলে আর মেয়ে কথা বলতে দেখলেই সেটাকে প্রেমের সম্পর্ক টানেন। কাউকে যদি বাহিরে দেখে কথা বলতে তাহলে ওনি সেটি ভিডিও করেন। ভিডিও করে বলে সেটা ওনি প্রিন্সিপালের কাছে দেবে। গার্ডিয়ানকে দেবে বলে থ্রেট দিয়েছে ও ব্ল্যাকমেইলও করেছে।’
অপর শিক্ষার্থীরও একই অভিযোগ। তিনি জানান, ‘একদিন অফ পিরিয়ডে আমরা খেলছিলাম। আমি আমার ছেলে বন্ধুর পেছনে দৌড়াচ্ছিলাম। সেটা ওনি (বরুণ কুমার বিশ্বাস) ভিডিও ধারণ করে করেছেন। পরে আমাকে একা ডেকে তিনি এই ভিডিও আমার বাবা-মাকে পাঠাবেন বলে হুমকি দেন। এছাড়া তিনি প্রায়শই আমাকে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলতেন।’
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত শিক্ষক বরুণ কুমার সাহাকে এই প্রতিবেদক একাধিকবার ফোন করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. জামিল উদ্দীন জানান, ‘ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আপত্তিকর আচরণের অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করি। তবে কমিটির কয়েকজন শিক্ষক ট্রেনিংয়ে ছিল। তদন্ত করার জন্য ওই শিক্ষকদের ওয়ার্কিং ডে-তে না পাওয়ায় তদন্ত কাজ আগায়নি।’
তিনি বলেন, ‘গত ৭ মে শিক্ষার্থীরা এসে দ্রুত তদন্ত কাজ শেষ করার জন্য চাপ দিলে আমি আরেকটা কমিটি গঠন করি। শিক্ষার্থীদের দেওয়া একদিনের সময়ের মধ্যেই ওনারা তদন্ত শেষ করেছেন। ইতোমধ্যেই সেটার ড্রাফট আমার কাছে জমা দিয়েছেন। আমরা আগামীকাল সকালেই সেটা বিশ্ববিদ্যালয় বরাবর পাঠিয়ে দেব।’
তিনি জানান, ‘এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। প্রক্টর পদত্যাগ করায় আমি শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী প্রক্টরের হোয়াটসঅ্যাপে আমি তদন্তের ড্রাফট পাঠিয়ে দিয়েছি।’
তদন্ত নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘এখনও কমিটি ড্রাফট জমা দিয়েছে। তারা স্বাক্ষর না করায় হয়ত আরও কয়েকটা সুপারিশ যুক্ত হতে পারে। আমি এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

0 মন্তব্যসমূহ