লালমনিরহাটে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃতকে জুলাই শহীদ বানিয়ে মামলা বানিজ্য, সাংবাদিকদের হয়রানি




তার মতো ভালো মানুষ ছিল না। কোনো নির্দোষ মানুষের ক্ষতি করে আমার বাবাকে কবরে কষ্ট দিতে চাই না।’ না জানিয়ে কিংবা অনুমতি না নিয়ে হত্যা মামলা দায়ের করায় বাদী মোশাররফ হোসেনের বিচার চেয়েছে পরিবারটি।

গত বছরের ৮ জুলাই পুলিশ মহাপরিদর্শক, পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন দপ্তরে নিজের ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় হওয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন এই হতভাগা বাবা আব্দুর রহিম। ওই আবেদনে তিনি লিখেছেন, ‘বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক হিংসা চরিতার্থ করার হীন উদ্দেশ্যে আমার ছেলের মৃত্যু সনদ ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে বহু নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।’

আবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, ‘সরকার পতনের দিন কাউয়ামারী বাজারে স্থানীয় লোকজনসহ আনন্দ ও বিজয় মিছিল করার সময় আকস্মিকভাবে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আজিজুল ইসলামের শরীরে পড়লে সে শক পেয়ে অবচেতন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পরে উপস্থিত লোকজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’

আব্দুর রহিম আবেদনে আরো উল্লেখ করেছেন, “আমার ‘অগোচরে ও অনুমতি ব্যতিরেকে’ এবং ‘অসৎ উদ্দেশ্যে ও দুরভিসন্ধিমূলকভাবে’ মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। আমি বা আমার পরিবারের কোনো সদস্য ওই মামলা করেনি এবং আমি বা আমার পরিবার কোনো ধরনের আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” ওই আবেদনে মামলায় নাম থাকা আসামিদের নিরপরাধ বলেও দাবি করেন নিহতের বাবা।

এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রকাশিত জুলাই ২০২৪ বিপ্লবের শহীদ স্মারকে উঠে এসেছে আজিজুলের নাম। ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতার শহীদ যারা’ প্রকাশনার নবম খণ্ডে বলা হয়, ‘শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করে চলে যাওয়ার পর মানুষ আনন্দ মিছিল বের করে। সেই মিছিলে যোগ দেন হাফেজ আজিজুল। সন্ধ্যা ৬টার দিকে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসংবলিত একটি ডিজিটাল সাইনবোর্ডে লাঠি দিয়ে আঘাত করলে তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। আনুমানিক ২০ মিনিট বৈদ্যুতিক তারে ঝুলে ছিলেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মামলার বাদী মোশাররফ হোসেন লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সিঙ্গিমারী ইউনিয়নের সিঙ্গিমারী গ্রামের আব্দুস সালামের ছেলে। গত বছরের ৫ মার্চ উপসচিব (গেজেট) হরিদাস ঠাকুর স্বাক্ষরিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী মোশাররফ ‘গ’ শ্রেণির জুলাইযোদ্ধা। তাঁর গেজেট নম্বর ৭১৯ ও মেডিক্যাল কেস আইডি নম্বর ১৫২১৪। প্রজ্ঞাপনে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে সফিপুর, কালিয়াকৈর, গাজীপুর উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় কর্মস্থল হিসেবে আমি সফিপুরে অবস্থান করে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আহত হয়েছিলাম।’

তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তির লালমনিরহাট জেলা সদস্যসচিব। এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘ওয়ারিয়র্স অব জুলাই’-এর লালমনিরহাট শাখার সাধারণ সম্পাদক।

সাংবাদিককে হত্যা মামলার আসামি বানানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সারা দেশে দায়ের গণহত্যার মামলাগুলোর সব আসামিকেই যে সব বাদী চেনেন, বিষয়টা এমন নয়। এখানে সন্দেহভাজনভাবে বেশির ভাগ মানুষের নাম দেওয়া হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে যারা সত্যিকারের দোষী তারাই মূলত চার্জশিটভুক্ত হবে। যেহেতু বিষয়টি তদন্তাধীন, সেহেতু আপনি-আমি এখন এ বিষয়ে কথা না বলাটাই ঠিক হবে।’

‘আমরা চাই প্রতিটি গণহত্যার বিচার হোক’—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ফ্যামিলিটা কিন্তু প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। শুধু তারা বা যে ছেলেটা মারা গেছে, ওই ছেলেটাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ওই সময় ওরা মামলা করতে ভয় পেয়েছিল। তারা একসময় তাদের বাড়িতে ডেকে আমাকে খাওয়াদাওয়া করিয়ে বলে, ‘আপনি যদি মামলার বাদী হন তাহলে আমার ছেলের ন্যায্য বিচারটা পাবে।’ এই কথার ওপর আমি মামলার বাদী হয়েছি।”

মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পাটগ্রাম থানার এসআই আব্দুল জলিল বলেন, ‘ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে আজিজুলের লাশ উত্তোলনের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে।’

নিহতের বাবার মামলা প্রত্যাহারের আবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আপাতত এই বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।’ ওই দুই সাংবাদিককে অব্যাহতি দিতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।

সহকারী পুলিশ সুপার (বি সার্কেল) জয়ন্ত কুমার সেন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এই মামলায় ১৩ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লাশ উত্তোলন বিষয়ে বিজ্ঞ আদালতের আদেশ সাপেক্ষে পরবর্তী আইনানুগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।’

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ