পঞ্চগড়ের ভাউলাগঞ্জে পাঁচ বছর বয়সী শিশু মোবাশ্বের হোসেনকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সিয়াম আহম্মেদ মিঠুকে (২২) মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৭০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে, যা ক্ষতিপূরণ হিসেবে নিহত শিশুর পরিবারকে প্রদান করা হবে।
রোববার (২১ জুন) পঞ্চগড়ের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক হুসাইন মুহম্মদ ফজলুল বারী বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত সিয়াম আহম্মেদ মিঠুর বাড়ি বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া এলাকায়। ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ১৬ বছর। ২০২০ সালের ১০ মে নিহত শিশুর বাবা আলম হোসেন দেবীগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৮ মে দেবীগঞ্জ উপজেলার চিলাহাটি ইউনিয়নের নায়েকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আলম হোসেনের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মোবাশ্বের হোসেন নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা যায়, নিখোঁজ হওয়ার আগে শিশুটিকে সর্বশেষ সিয়াম আহম্মেদ মিঠুর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল।
তদন্তে উঠে আসে, অভিযুক্ত ও নিহত শিশু একই এলাকার প্রতিবেশী ছিল। শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার পর অভিযুক্ত নিজেও পরিবারের সঙ্গে খোঁজাখুঁজিতে অংশ নেয় এবং এলাকায় মাইকিং করার কাজেও যুক্ত ছিল। ফলে শুরুতে তার প্রতি কারও সন্দেহ তৈরি হয়নি। তবে তদন্তের একপর্যায়ে ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্য বেরিয়ে আসে।
পরবর্তীতে নিকটবর্তী একটি বেতবাগান থেকে মোবাশ্বের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মামলার তদন্ত চলাকালে সিয়াম আহম্মেদ মিঠু বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। পরে পুলিশ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
বিচারকালে রাষ্ট্রপক্ষের ২০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ, জবানবন্দি, সামাজিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন এবং ভিকটিম ইমপ্যাক্ট বিবরণী পর্যালোচনা শেষে আদালত অভিযুক্তকে শিশু অপহরণ ও হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন।
রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ধারায় শিশু অপহরণের দায়ে ৭ বছরের আটকাদেশ ও ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ৩ মাসের আটকাদেশ দেওয়া হয়। এছাড়া দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার দায়ে ১০ বছরের আটকাদেশ ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের আটকাদেশ প্রদান করা হয়। আদালত নির্দেশ দেন, উভয় সাজা ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে।
এছাড়া অর্থদণ্ড হিসেবে আদায়কৃত মোট ৭০ হাজার টাকা নিহত শিশুর মা সেলিনা বেগমকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রায় ঘোষণার পর নিহত শিশুর বাবা আলম হোসেন বলেন, যে আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, সে ছিল আমাদেরই প্রতিবেশী। ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে আমরা যখন দিশেহারা, তখন সেও আমাদের সঙ্গে খোঁজাখুঁজি করেছে, মাইকিং করেছে। কখনো ভাবিনি সেই-ই আমার সন্তানের ঘাতক। দীর্ঘ ছয় বছর পর আদালতের এই রায়ে আমরা কিছুটা হলেও ন্যায়বিচার পেয়েছি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পঞ্চগড়ের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. খলিলুর রহমান বলেন, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, জবানবন্দি এবং অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে আদালত এ রায় দিয়েছেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ রায়। রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে সন্তুষ্ট।

0 মন্তব্যসমূহ