মাদক ‘হটস্পটে’ পরিণত রংপুর বিভাগ; ৪৩ সীমান্তপথে ঢোকে মাদক


 নিয়মিত অভিযান, গ্রেপ্তার ও হাজার হাজার মামলা হওয়ার পরও ভারতীয় সীমান্তবর্তী রংপুর বিভাগের আট জেলায় মাদকের বিস্তার থামানো যাচ্ছে না। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এখন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও বিভিন্ন ধরনের মাদক।

 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার সীমান্তবর্তী অন্তত ৪৩টি রুট ব্যবহার করে দেশে মাদক প্রবেশ করছে। এসব সীমান্ত দিয়ে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন ও নেশাজাতীয় ইনজেকশন দেশে ঢুকছে।

 

পরে রংপুরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হচ্ছে। রংপুর নগরীর কেডিসি, কেরানীপাড়া, নূরপুর, মহাদেবপুর, গোমস্তাপাড়া, আলমনগর কলোনী, সেন্ট্রাল রোড, শালবন মিস্ত্রিপাড়া, শাপলা চত্বর চামড়াপট্টি, জুম্মাপাড়া, বাবুখাঁ, আমাশু কুকরুল, দর্শনা রেলগেট, আলমনগর বাবুপাড়া, হারাগাছ, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনার অভিযোগ রয়েছে।

তিন মাসে মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার ১৬২৬

এদিকে রংপুর মহানগরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে গত তিন মাসে মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় এক হাজার ৬২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে ১১.৫২৫ কেজি গাঁজা, ৬৩১ পিস ইয়াবা, ৪১.৯ গ্রাম হেরোইন, ৩০ পিস ট্যাপেন্ডল ট্যাবলেট, ৭২ বোতল এসকাফ (ফেনসিডিল সদৃশ) এবং ২ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা মাদকের আনুমানিক মূল্য পাঁচ লাখ ৯৬ হাজার ৫০ টাকা। একই সময়ে ৬০টি মাদক মামলা রুজু করে ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

যেসব কারণে মাদক ‘হটস্পটে’ পরিণত রংপুর বিভাগ

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সীমান্তঘেঁষা ভৌগোলিক অবস্থান, সংঘবদ্ধ মাদক ও চোরাকারবারি চক্রের তৎপরতা, মাদকপাচারের সহজ রুট, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধের ঘাটতির কারণে রংপুর বিভাগ উত্তরাঞ্চলের অন্যতম মাদক ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রংপুর জেলা কমিটির আহ্বায়ক মো. আল মামুন বলেন, আমরা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ে মাদকের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে মতামত দিয়ে আসছি। কিন্তু মাদকসেবী ও কারবারিদের সেইভাবে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, মাছুয়াপাড়ায় চার মাস আগে একটি খুনের ঘটনা ঘটেছিল, সেটিও মাদক কেন্দ্রিক ছিল। আমরা তখন খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিলাম— ওই এলাকার ৯০ ভাগ পরিবার মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাকি ১০ ভাগের একটি ছিল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি এই ব্যাপারটাকে বেশি গুরুত্ব দিতো তাহলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যার ঘটনা নাও ঘটতে পারতো।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী ঢাকা পোস্টকে বলেন, মাছুয়াপাড়ায় চারজন হত্যার ঘটনার পর প্রশান্তসহ অন্য মাদক কারবারিরা গা ঢাকা দিয়েছে। তারপরও আমরা মাদকের এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে চেষ্টা করছি। আমাদের অভিযান ও শিক্ষক পরিবারের হত্যার ঘটনাকেন্দ্রিক তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, এখন রংপুর শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে মাদক। চার খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত দুজনই মাদকাসক্ত। তারা অনেক দিন ধরেই মাদক সেবন করতো। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটানোর আগে ও পরে তারা মাদক করেছিল।

তিনি আরও বলেন, মাদক কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, কোনো বাহিনীর সমস্যাও নয়। এটা সামাজিক, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা। রংপুরে সহজলভ্য হচ্ছে ইয়াবা, এটা বাংলাদেশে তৈরি হয় না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এই মাদক তৈরি হয়, তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক খুব একটা ভালো না। তাদের সাথে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতির মাধ্যমে সীমান্তবর্তী এলাকায় ইয়াবা তৈরির যেসব ফ্যাক্টরি রয়েছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে।

সনাতন চক্রবর্তী বলেন, নেশাজাতীয় ট্যাবলেট ইয়াবা সীমান্ত হয়ে আমাদের দেশে ঢুকে। এই অবৈধ চোরাচালান ও মাদকের কারবারি বন্ধে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এটা শুধু রংপুর নয়, সারা দেশের সমস্যা। চাহিদা আছে বলেই এর সরবরাহ কমছে না। তাই মাদকসেবী কমাতে হবে, তাদের চিকিৎসার উদ্যোগ নিতে হবে। মাদকাসক্তি একটা রোগ, মানসিক বিকৃতি। চিকিৎসার মাধ্যমে মাদকসেবীদের ভালো করা সম্ভব।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ